পন্ডিত পল্টু সমাচার

আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর পন্ডিত পল্টু জনগন আছেন। এই পন্ডিতরা 120nm ডায়ামিটারের এইচআইভি ভাইরাসের চেয়েও ভয়ংকর, 1 nm দৈর্ঘ্যের মাইকোব্যাকটেরিয়ামের চেয়েও ক্ষতিকর।

 

এইডসে কতজন মারা যাচ্ছে তার খতিয়ান আছে, হার্ট অ্যাটাকে কতজন মারা যাচ্ছে তার খতিয়ান আছে, সড়ক দুর্ঘটনায় কতজন মারা যাচ্ছে তারও হিসাব আছে।

কিন্তু এইসব পন্ডিত পল্টুর জন্য কতজনের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে তার কোনো হিসাব কোথাও নেই।

 

হাসপাতালে কিডনি, হার্ট, ব্রেইন বা লিভারের ১১:৫৯ বাজিয়ে যতো রোগী আসেন খোঁজ নিলে দেখা যাবে এদের বেশিরভাগেরই এক বা একাধিক পন্ডিত পল্টু আত্মিয় ছিলেন। এই পন্ডিতরা কোনো না কোনোভাবে রোগীকে ভুলভাল পরামর্শ দিয়েছেন এবং সর্বনাশ করে ফেলেছেন।

 

আপনার-আমার আশেপাশেও এমন পল্টু আছেন, আপনি তাঁদের চিনেনও!

না চিনলে একটু পরিচয় করিয়ে দেই।

 

জনৈক হাবিব সাহেবের ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। ডাক্তার তাকে ওষুধ দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, ‘বাকি জীবন ওষুধ খেতে হবে।’

হাবিব সাহেব পরের দিন গেলেন অফিসে। গিয়ে দেখা হলো পন্ডিত পল্টুর সাথে।

হাবিব সাহেব বিরস বদনে জানালেন তার ডায়াবেটিস হয়েছে এবং তাকে সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে।

পন্ডিত পল্টু কিছুক্ষণ চোখ বড় করে তাকালেন।

তারপর এগাল-ওগাল হেসে বললেন, ‘হা হা হা হা… এইগুলা ভুয়া! ওষুধ টষুধ কিচ্ছু লাগবে না। ধুর মিয়া। আমার উপরের ফ্ল্যাটের সুবহানের কতদিন ধরে ডায়াবেটিস! সব সময় ১৪ থাকে। কিচ্ছু হয়না।’

হাসি থামিয়ে পন্ডিত পল্টু চিনি মেশানো চায়ে চুমুক দেন। হাবিব সাহেবকেও এক কাপ অফার করেন।

হাবিব সাহেব চা খেতে খেতে ভাবেন, পল্টু সাহেবের কথায় যুক্তি আছে। তিনি তো পন্ডিত মানুষ! থাক! আর ওষুধ খাবো না।

 

কিংবা ধরুন হাবিব সাহেবের উচ্চ রক্তচাপ। ডাক্তার ৫০ মিলিগ্রাম লোসারটান দিলেন।

পরের দিন হাবিব সাহেবের সাথে দেখা হলো পন্ডিত পল্টুর।

পল্টু শুনলেন হাবিব সাহেবের কথা। তারপর লর্ড অফ রিং-এর গ্যান্ডালফের মতো জ্ঞানী জ্ঞানী চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন অসীমের পানে।

…তারপর হঠাৎ অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘ধুর মিয়া! আমার নিজের প্রেশার সব সময় থাকে ১৬০। তো আমি কি মরে গেছি নাকি? ওষুধ বাদ দেন। বাদ দিয়ে তেতুলের রস খান।

হাবিব সাহেব ভাবেন, কথা তো সত্য। তেতুলের রস খেলে প্রেশার কম – তিনি তো আগেও শুনেছেন এসব কথা।

 

কিংবা ধরুন হাবিব সাহেবের হার্টে সমস্যা। ডাক্তার তাকে ইকোস্প্রিন দিয়ে বাসায় পাঠালেন।

পরের দিন আসলেন পন্ডিত পল্টু।

এসেই ধমক দিলেন হাবিব সাহেবকে, ‘ধুর মিয়া। এই বয়সে হার্টের ওষুধ খাইলে হবে? কিচ্ছু হবেনা। আমার দুলাভাইকে ১০ বছর আগে ডাক্তার বলেছিলো হার্টের অবস্থা খারাপ। তিনি এখনও পুরো ভালো। আর আপনি মিয়া এখনই হার্টের ওষুধ খাবেন? বাদ দেন মিয়া এইগুলা। হায়াত মউত উপর ওয়ালার হাতে।’

হাবিব সাহেব ভাবেন – কথা তো সত্য!

 

হাবিব সাহেবরা পন্ডিত পল্টুর কথা মতো ৮/১০ বছর কাটিয়ে দেন।

 

তারপর… কোনো এক ভোরে আবিষ্কার করেন তার বুকে চাপচাপ ব্যাথা। দৌড়ে ভর্তি হন হাসপাতালে। জানতে পারেন হার্ট অ্যাটাক। পরেরদিন সকালে জানতে পারেন কিডনির অবস্থাও ভালো না। ক্রিয়েটিনিন ৪.২। বুঝতে পারেন কেন মাঝে মাঝে পায়ে পানি জমতো!

পরেরদিন জানতে পারেন ভালো না লিভারের অবস্থাও। তারপরের দিন জানতে পারেন শরীরে চর্বি আর চর্বি।

পরেরদিন হার্ট আর কাজ করে না। সিরিঞ্জ পাম্পে চলে ডোপামিন আর নরএড্রেনালিন। হাসপাতালের বিল-এ নতুন নতুন ডিজিট যোগ হয়।

বাইরে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলেন হাবিব সাহেবের অসহায় স্ত্রী আর ৫ বছর বয়েসী কন্যা। এই কন্যাটি তখনও জানে না তার বাবা আর কখনো সুস্থ অবস্থায় বাসায় ফিরবে না।

 

পন্ডিত পল্টুদের অবশ্য তখন আর আশেপাশে দেখা যায় না। তারা বাসা থেকে একবার ফোনে খোঁজ নিয়ে দায়িত্ব শেষ করে ফেলেন।

 

##

আপনার পাশের পন্ডিত পল্টুটিকে চিনে রাখুন। চিনে রাখুন আপনার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগেই।

 

##

আর আপনি নিজেই যদি সেই পন্ডিত পল্টু হয়ে থাকেন তাহলে প্লিজ থামেন, প্লিজ। আপনি একজন খুনী। আপনার হাতে রক্ত নেই, তবে অনেক দীর্ঘশ্বাস লেগে আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *