মাথা ঘুরছে? অনেকেই প্রথমেই ভয় পেয়ে যান—ব্রেনের কোনো সমস্যা হলো না তো? স্ট্রোক বা টিউমার নয় তো? MRI করাতে হবে না তো?
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাথা ঘোরার সব কারণ মস্তিষ্কের রোগ নয়।
মাথা ঘোরা (Dizziness/Vertigo) একটি উপসর্গ, কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এর পেছনে অনেক ধরনের কারণ থাকতে পারে।
মাথা ঘোরার কারণ কী কী?
১. কানের ভেতরের সমস্যায়
আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে অন্তঃকর্ণে (Inner ear)। এখানে সমস্যা হলে মাথা ঘুরতে পারে।
যেমন—
- BPPV (Benign Paroxysmal Positional Vertigo)
- Vestibular neuritis
- Ménière’s disease
বিশেষ করে BPPV-তে বিছানায় পাশ ফিরলে, শোয়া থেকে উঠলে বা মাথার অবস্থান পরিবর্তন করলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ ঘুরছে বলে মনে হয়।
২. রক্তচাপ কমে গেলে
অনেকের বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে হঠাৎ দাঁড়ালে মাথা ঘোরে। একে Orthostatic hypotension বলে।
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা রক্তচাপের ওষুধ খান, তাদের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া
রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা হালকা লাগা বা মাথা ঘোরার অনুভূতি হতে পারে।
৪. রক্তে সুগারের সমস্যা
রক্তে সুগার অতিরিক্ত কমে গেলে মাথা ঘোরা, ঘাম, বুক ধড়ফড়, কাঁপুনি এমনকি অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
৫. পানিশূন্যতা
পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বা ডায়রিয়ার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা হলে মাথা ঘুরতে পারে।
৬. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু রক্তচাপের ওষুধ, ঘুমের ওষুধ, উদ্বেগের ওষুধ এবং অন্যান্য ওষুধের কারণে মাথা ঘোরার সমস্যা হতে পারে।
৭. মাইগ্রেন
Vestibular migraine-এর কারণে মাথাব্যথা ছাড়াও মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যহীনতা হতে পারে।
তাহলে কি ব্রেনের রোগে মাথা ঘোরে না?
অবশ্যই ঘোরে।
বিশেষ করে Cerebellum বা Brainstem-এর স্ট্রোক হলে মাথা ঘোরা, ভারসাম্য হারানো, হাঁটতে সমস্যা, চোখের অস্বাভাবিক নড়াচড়া এবং অন্যান্য স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তাই মাথা ঘোরাকে কখনোই অবহেলা করা যাবে না।
হঠাৎ তীব্র মাথা ঘোরার সঙ্গে কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হওয়া, ডাবল ভিশন, গিলতে সমস্যা, নতুন তীব্র মাথাব্যথা বা দাঁড়াতে ও হাঁটতে না পারার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
মাথা ঘুরলেই কি MRI করতে হবে?
না।
প্রত্যেক মাথা ঘোরা রোগীর MRI প্রয়োজন হয় না।
মাথা ঘোরার ধরন, কতক্ষণ থাকে, কী কারণে শুরু হয়, মাথার অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না, সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন চিকিৎসক রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস, রক্তচাপ, প্রয়োজনীয় শারীরিক ও স্নায়বিক পরীক্ষা এবং ভারসাম্যসংক্রান্ত পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেন, কোন পরীক্ষা প্রয়োজন।
অনেক ক্ষেত্রে রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমেই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।
এখানেই মেডিসিন বিশেষজ্ঞের ভূমিকা
মাথা ঘোরার রোগীকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে শুধু ব্রেনের কথা চিন্তা করলে চলবে না।
রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা, ডায়াবেটিস, পানিশূন্যতা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক কারণও বিবেচনা করতে হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী ENT বা Neurology বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
অর্থাৎ, মাথা ঘোরার চিকিৎসা শুরু হয় কারণ নির্ণয়ের মাধ্যমে, MRI করার মাধ্যমে নয়।
মনে রাখবেন
মাথা ঘোরা মানেই ব্রেনের রোগ নয়।
আবার মাথা ঘোরার অর্থ এই নয় যে ব্রেনের কোনো সমস্যা নেই।
একই উপসর্গের পেছনে অনেক ধরনের রোগ থাকতে পারে। তাই নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
একটি উপসর্গ দেখে নয়, পুরো রোগীকে মূল্যায়ন করেই সঠিক রোগ নির্ণয় করতে হয়।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য — ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চেম্বার: আল হারামাইন হাসপাতাল, সোবহানীঘাট, সিলেট (বিকাল ৫টা – রাত ৯টা, শুক্র ও সোমবার বন্ধ)।
