স্ট্রোকের পর শুধু ওষুধের পেছনে ছুটবেন না

স্ট্রোক হওয়ার পর রোগী ও পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি দেখা যায়, তা হলো—একজন ডাক্তারের কাছ থেকে আরেকজন ডাক্তারের কাছে ছুটে বেড়ানো, নতুন নতুন ওষুধের খোঁজ করা।

“কোন ওষুধে হাত-পা দ্রুত ঠিক হবে?”

“কোন ওষুধ খেলে কথা দ্রুত ফিরে আসবে?”

“এমন কোনো ওষুধ আছে কি, যেটা খেলে ব্রেনের ক্ষতি পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে?”

এই প্রশ্নগুলো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এখানেই অনেক রোগী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যান।

যে ক্ষতিটা হয়ে গেছে, সেটার জন্য ম্যাজিক কোনো ওষুধ নেই

স্ট্রোকের সময় মস্তিষ্কের একটি অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা রক্তক্ষরণ হতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কের যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই ক্ষতির পর রোগীর হাত-পা দুর্বল হওয়া, কথা বলতে সমস্যা হওয়া, গিলতে সমস্যা হওয়া, হাঁটতে সমস্যা হওয়া বা দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এই হয়ে যাওয়া ক্ষতি কয়েকটি নতুন ওষুধ খেলেই আগের অবস্থায় ফিরে যাবে—এমন কোনো ম্যাজিক ওষুধ নেই।

তাই রোগী যদি হাত-পা দুর্বল হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন, তখন শুধু ওষুধের তালিকা বড় করতে থাকলে হবে না।

তাকে আবার হাঁটতে শেখাতে হবে।
হাতের ব্যবহার ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রয়োজনে কথা বলার অনুশীলন করাতে হবে।
গিলতে সমস্যা থাকলে তার জন্য থেরাপি দিতে হবে।
দৈনন্দিন কাজগুলো আবার করতে শেখাতে হবে।

অর্থাৎ, প্রয়োজন অনুযায়ী rehabilitation শুরু করতে হবে।

তাহলে স্ট্রোকের পর এত ওষুধ কেন দেওয়া হয়?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে।

স্ট্রোকের পর দেওয়া অনেক ওষুধের প্রধান উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী স্ট্রোক প্রতিরোধ করা—অর্থাৎ secondary prevention।

যেমন রোগীর স্ট্রোকের ধরন ও কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক দিতে পারেন—

  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ
  • Statin
  • Antiplatelet
  • অথবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে Anticoagulant
  • ডায়াবেটিস ও অন্যান্য vascular risk factor-এর চিকিৎসা

এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এগুলোর মূল উদ্দেশ্য সাধারণত যে স্ট্রোকটি হয়ে গেছে সেটিকে একটি ট্যাবলেট দিয়ে মুছে ফেলা নয়; বরং ভবিষ্যতে আবার স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি কমানো।

সবচেয়ে বড় ভুলটি কোথায়?

ভুলটি হলো—রোগী ও পরিবার ওষুধকে মূল চিকিৎসা মনে করে rehabilitation-কে দ্বিতীয় সারির বিষয় মনে করেন।

ফলে দেখা যায়, রোগী মাসের পর মাস নতুন নতুন ওষুধ খুঁজছেন, কিন্তু নিয়মিত ফিজিওথেরাপি করছেন না।

কেউ কেউ মনে করেন—

“আগে একটা ভালো ওষুধ খাই, হাত-পা একটু ভালো হলে তারপর ফিজিওথেরাপি করব।”

বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টোভাবে ভাবতে হবে।

ওষুধ দিয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো এবং rehabilitation দিয়ে হারানো কার্যক্ষমতা যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা—দুটিই একসঙ্গে চলতে হবে।

মনে রাখবেন

স্ট্রোকের পর চিকিৎসা শুধু প্রেসক্রিপশনের কয়েকটি ওষুধের নাম নয়।

Secondary prevention-এর ওষুধ + Rehabilitation + Risk-factor control + নিয়মিত follow-up—সবকিছু মিলেই স্ট্রোকের পরের চিকিৎসা।

তাই একজন স্ট্রোক রোগীকে শুধু এক ডাক্তার থেকে আরেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে নতুন ওষুধ খুঁজতে থাকবেন না।

প্রয়োজনীয় ওষুধ অবশ্যই চলবে। কিন্তু যে চিকিৎসাটি রোগীর হারানো সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সেই rehabilitation যেন কোনোভাবেই বাদ না যায়।

কারণ স্ট্রোকের পর অনেক সময় রোগীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি নতুন ওষুধ নয়—সঠিক rehabilitation, নিয়মিত অনুশীলন এবং সময়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *